ঢাকা, ৩০ নভেম্বর মঙ্গলবার, ২০২১ || ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
 নিউজ আপডেট:

ভাইরাস ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে দারুচিনি 

ক্যাটাগরি : ফিচার প্রকাশিত: ৫৮৫৩ঘণ্টা পূর্বে


ভাইরাস ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে দারুচিনি 

দারুচিনি এই গ্রহের সবচেয়ে বেশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ভেষজ। এর মিষ্টি স্বাদ এবং সুন্দর সুবাস জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে প্রায় প্রত্যেক সংস্কৃতির দ্বারা সম্মানিত হয়ে আসছে। দারুচিনিতে রক্তের শর্করার রোধক সহ উন্নত অসাধারণ ঔষধি গুণাবলী রয়েছে যা , প্রদাহ কমাতে এবং স্নায়বিক স্বাস্থ্য উন্নীত করতে সহায়তা করে। এছাড়াও সুগন্ধি মসলা হিসাবে দারুচিনি ব্যপকভাবে পরিচিত । শুধু রান্নায় গন্ধ বৃদ্ধি নয়, শরীর ও ত্বক উভয়ের জন্যই দারুচিনির ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই দারুচিনিই যে আপনার শরীরের যাবতীয় ভাইরাস ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে, তা কি জানতেন? গবেষণা ঠিক এই তথ্যই দিচ্ছে। প্রাচীন কালে বহু ভাইরাস ধ্বংস করে দেওয়ার নজির দেখিয়েছে এই দারুচিনিই। তাই সুগন্ধি এই পদকে শুধু খাবারে ব্যবহার করলেই চলবে না। গবেষকরা বলছেন, করোনার কালবেলাতেও প্রতিষেধক হিসেবে কাজে আসতে পারে দারুচিনি। তবে খাবারের সঠিক পদ্ধতিটি জানতে হবে। কোন সময়ে, ঠিক কী ভাবে দারুচিনি খেলে তা শরীরের জন্য কাজে আসবে, জানতে হবে সে পদ্ধতিও। আবার বেশি পরিমাণে দারুচিনি খেয়ে ফেললেও হিতের বিপরীত হতে পারে। 


বর্তমান কোভিড (COVID-19) পরিস্থিতিতেও বিশ্বের বেশ কিছু দেশে প্রতিষেধক হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে দারুচিনি। বিশেষ করে ডাক্তার থেকে শুরু করে গবেষকরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুচিনি খেতে বলছেন। তবে এখনও পর্যন্ত দারুচিনি করোনাভাইরাস (Coronavirus) ধ্বংস করতে পারে কি না, সেই বিষয়ে কোনও প্রমাণ না মিললেও ডাক্তাররা বলছেন সংক্রমণের তীব্রতা প্রতিরোধ করতে পারে দারুচিনি। তবে তা ঠিকঠাক পদ্ধতি মেনে খেতে হবে। আর কোন সময়ে খাওয়া হচ্ছে, এবং কতটা পরিমাণে দারুচিনি খাওয়া হচ্ছে তার উপরেও নির্ভর করছে এর গুণাগুণ।

ভারতেরই এক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, দারুচিনির প্রোসায়ানাইডিন পলিমার এইচআইভি (HIV) সংক্রমিত ব্যক্তিদেরকে এইচআইভি কন্ট্রোলার্সে (HIV Controllers) পরিণত করতে পারবে। গবেষকরা আসে দারুচিনিতে যে মলিকিউল পেয়েছেন তা এইচআইভি ভাইরাসকে দমিয়ে রেখে ডিফেন্স প্রোটিনকে সুরক্ষা দিতে পারে। এছাড়াও সেই গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, দারুচিনির সিনামালডিহাইড শ্বাসতন্ত্রের রোগ অ্যাডিনোভাইরাসের (Adenoviruses) বিরুদ্ধে কার্যকর।

দারুচিনির উপকারিতা:
১। ওজন কমাতে সাহায্য করে:
বর্তমানে প্রতি দুই থেকে তিন জনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি একটি চিন্তার বিষয়। খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে যথাযথ নজর না দেওয়া, সঠিক যত্নশীল না হওয়া এবং সঠিক ভাবে শ্রম তথা যোগ ব্যায়াম, প্রাণায়াম না করার জন্য এই ওজন বাড়ার সমস্যা দেখা দিতে থাকে। এমত অবস্থায় খাবারে দাঁরুচিনির ব্যবহার করলে ওই বর্ধিত ওজন জনিত সমস্যা বেশ অনেকটাই কমতে পারে। দাঁরুচিনি তে বর্তমান poly phenols একটি antioxidant যা ইন্সুলীন এর সংবেদনশীলতা কে বাড়িয়ে রক্তের glucose এর মাত্রা কে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু আমাদের শরীর যখন সঠিক মাত্রায় ইন্সুলীন তৈরী পারে না তখনই রক্তে গ্লুকোস এর মাত্রা বেড়ে যায় এর ফলে স্থূলতা, মধুমেহ (ডায়াবেটিস্) এবং আরও কিছু রোগ এর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একটি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে পলি সিস্টিক ওভারীয়াণ (poly cystic ovarian disease) অসুখ আছে, তাদের ক্ষেত্রে দাঁরুচিনি ইন্সুলীন প্রতিরোধ কে কমিয়ে ওজন বেড়ে যাওয়া কে নিয়ন্ত্রণ করে ।এ ছাড়া দাঁরুচিনির অ্যন্টি-ওবেসিটি প্রভাব স্থূলত্ব কে কম করে।
উপকরণ:
জল এক কাপ
এক চামচ দাঁরুচিনি পাউডার/ গুড়া
মধু এক চামচ
লেবুর রস এক চামচ
বানানোর পদ্ধতি:
প্রথমে জল কে ফোটাতে হবে। একটি কাপে দাঁরুচিনি গুড়ো বা পাওডার মধু আর লেবুর রস এক সাথে একটা মিশ্রণ তৈরী করতে হবে। এবার এই মিশ্রণে ঐ ফোটানো গরম জল মিশিয়ে একটা মিশ্রণ বানিয়ে নিতে হবে। এই মিশ্রণ পান করতে হবে। ভাল ফল পেতে রোজ সকালে এই মিশ্রণ পান করতে হবে।

২। আর্থারাইটিসের ব্যাথা কমায় দারুচিনি:
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের হাড় গুলি দুর্বল হতে থাকে, আবার কেউ কেউ আর্থারাইটিসে আক্রান্ত হন। এই আর্থারাইটিসে দাঁরুচিনি ঔষধের মত কাজ করে। দাঁরুচিনি তে আয়রণ(লৌহ), ক্যালসিয়াম, ম্যান্গানিজের মত ধাতব লবন গুলি থাকে যে গুলি এই গাঁটের যন্ত্রণায় উপশম পাওয়া যায় । একটা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে রিউমাটয়েড আর্থারাইটিসে্ যে যন্ত্রণা ও ফোলা ভাব হয় তাতে এই দারুচিনী অনেক টা উপকার দেয়|

উপকরণ:
দারুচিনির তেল
চার ফোঁটা নারকেল তেল / সরষের তেল
বানানোর পদ্ধতি:
দারুচিনীর তেল তিন থেকে চার ফোটা নারকেল তেল বা সর্ষের তেলের সাথে মিশিয়ে হালকা গরম করে মালিশ করতে হবে। এই মিলিশের ফলে ব্যাথায়ে অনেক টা আরাম পাওয়া যায়।

৩। দারুচিনি ব্লাড সুগার আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে:
অনিয়মিত, অনিয়ন্ত্রণ জীবনযাত্রার জন্য আজকাল অনেকেরই ডায়াবেটিস্ তথা মধুমেয় রোগ এর শিকার হয়ে পড়ছেন। প্রাথমিক পর্যায় এই রোগ এর দিকে নজর না দিলে ভবিষ্যতে এই রোগের জন্য বিপদের আশংকা থেকে যায়। সময় এর সাথে সাথে ডায়াবেটিস্ আরো কিছু কিছু রোগের জন্ম দেয়। ডায়াবেটিস্ তথা মধুমেহ রোগী যদি খাদ্যে দারুচিনী ব্যাবহার করেন তবে এই ডায়াবেটিসের এর হাত থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যায়। দাঁরুচিনি তে উপস্থিত আ্যন্টি আক্সিডেন্ট আক্সিডেটিস্ স্ট্রেস কে কমাতে সাহায্য করে যা নাকি ডায়াবেটিস্ এর একটি প্রধান কারণ । এই মশলায় উপস্থিত ফেনলীক যৌগ এবং ফ্লবনাইড যা কিনা আ্যন্টি ইন্ফ্লামেটরি 
আ্যন্টি ডায়াবেটিক্ এমন কি আ্যন্টি ক্যানসর এবং কার্ডিয় প্রোটেকটিভ গুণ সম্পন্ন । একটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে দারুচিনী রক্তের শর্করা মাত্রা কম করে। দাঁরুচিনি তে বর্তমান পলিফেনলস্ শরীরে ইন্সুলিন ক্ষরণের মাত্রা কে বাড়ায় তাই ডায়াবেটিস্ এর আশংকা কমে।

উপকরণ:
ছোট এক টুকরো আদা
দু চামচ লেবুর রস
এক টুকরো দারুচিনী
মধু এক চামচ
জল এক কাপ

বানানোর পদ্ধতি:
মাঝারি আঁচে জল গরম করতে হবে।আদা কে ছোট টুকরো বা ঘসে নিতে হবে। জল ফুটে উঠলে আদা গুলো দিয়ে দিতে হবে, এবার আঁচ কমিয়ে ওই মিশ্রণে দারুচিনী দিয়ে দিতে হবে, পাঁচ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এর পর একটা কাপে জল টা ছেকে নিতে হবে। এই জলে লেবুর রস আর মধু দিয়ে খেতে হবে।

৪। স্মরণ শক্তি বৃদ্ধিতে:
মস্তিষ্কের জন্য ও দাঁরুচিনি খুব উপকারী। দাঁরুচিনির সুগন্ধ মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি মস্তিষ্কের একটি টনিক। এটি যে শুধু মাত্র মস্তিষ্ক কে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম করে তাই নয়, একাকীত্ব, ডিপ্রেশন ও আ্যন্গজাইটিতে ও উপকার দেয়। যারা এই দারুচিনির তেলের ঘ্রাণ নেয় তাদের স্মরণ শক্তি বৃদ্ধি পায় । এছাড়া দারুচিনি তে বর্তমান আ্যন্টি আক্সিডেন্ট আ্যলজাইমার আর পারকিনসন্ এর মত রোগের হাত থেকেও রক্ষা করে।যখন আ্যলজাইমারে স্মৃতি শক্তি কমতে থাকে তখন অসতে আসতে শরীরে কম্পন শুরু হয়।

উপকরণ:
এক কাপ বা আধা কাপ জল
ছোট এক টুকরো দাঁরুচিনি
এ চামচ মধু

বানানোর পদ্ধতি:
জল ফোটাতে হবে
একটি পাত্রে দারুচিনী নিয়ে তাতে ওই গরম জল ঢেলে দিতে হবে
দশ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে যাতে দারুচিনীর সব গুনাবলী ঐ জলে বেরিয়ে আসে।
এর পর ঐ জল ছেকে তাতে মধু মিশিয়ে পান করতে হবে।

৫। সর্দি কাশি তে দারুচিনি:
দারুচিনিতে অ্যান্টি – মাইক্রবিয়াল আর অ্যান্টি ইনফ্লেমেটোরি গুন বর্তমান। এই গুণ আপনাকে সর্দি কাশি থেকে সুরক্ষা করে।
উপকরণ:
এক চামচ দারুচিনি গুড়ো
দুটো লবঙ্গর টুকরো
এক গ্লাস গরম জল
বানানোর পদ্ধতি:
দারুচিনি আর লবঙ্গর টুকরো কে জলে দিয়ে পাঁচ থেকে দশ মিনিট ফোটান আর ছেঁকে চামচ দিয়ে পান করুন
৬। রক্তসংবহনের জন্য দারুচিনির ব্যবহার:
দারুচিনি রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে। দারুচিনি তে এই গুণ গুলো ধমনী বা হৃৎপিণ্ড জনিত কোন অসুখ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। উন্নত রক্ত সংবহন শরীরের ব্যাথা বোধের হ্রাস ঘটিয়ে অক্সিজেনের চলাচল বৃদ্ধি করে।
৭। কোলেস্টেরল আর হৃদয়ের জন্য দারুচিনি:
দারচিনির ব্যাবহার শরীরের হানিকারক কোলেস্টেরল কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল এর মাত্রা বজায় রাখে। এটা টাইপ – ২ ডায়বেটিস এর রোগীদের জন্য খুব উপকারি।
ব্যবহারের পদ্ধতি:
দারুচিনি মিশিয়ে চা বানিয়ে খেতে পারবেন
শাঁক সব্জি তে এটার ব্যাবহার করলে স্বাদ ও বাড়াবে আর স্বাস্থ্য কে ভালো রাখবে
৮। নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ:
দারচিনির ব্যাবহার শুধু মাত্র দাঁত এর ব্যাথার জন্য ভালো নয়, এটার ব্যাবহার মুখের মধ্যে যে কোন সংক্রমণ আর দুর্গন্ধ কে দূরে রাখে।
৯। হজম শক্তি বাড়ানোর জন্য দারুচিনি:
দারুচিনির অ্যান্টি – মাইক্রবিয়াল গুণ আপনার শরীর কে যেকোনো সংক্রমণ, ব্যাকটেরিয়ার আর ক্যানডিডা নামক রোগ এর সাথে লড়তে সাহায্য করে।
১০। রক্ত চাপের সময় দারুচিনির উপকারিতা:
আজ কাল উচ্চ বা নিম্ন রক্ত চাপের লক্ষণ সবার মধ্যেই দেখা যায়। দারুচিনির প্রয়োগে এই সমস্যা কমানো যেতে পারে। বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়বেটিস এর রুগীদের জন্য খুব বেশী উপযোগী।

১১। ইনফারটিলিটী/ বন্ধ্যাত্ব তে দারুচিনি:
দারুচিনিতে অ্যান্টি – অক্সিডেন্ত আছে যেটা মোটা মানুষের মধ্যে অক্সিডেটীভ স্ট্রেস কে কম করতে সাহায্য করে। এর সাথে ইনফারটিলিটী/ বন্ধ্যাত্বকে কম করতেও সাহায্য করে।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন:
আরও সংবাদ পড়ুন