ঢাকা, ১৭ মে সোমবার, ২০২১ || ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
 নিউজ আপডেট:

বিষু ও ঘিলা খেলা প্রেক্ষিত: তনচংগ্যা

ক্যাটাগরি : ফিচার প্রকাশিত: ৮১৯ঘণ্টা পূর্বে


বিষু ও ঘিলা খেলা প্রেক্ষিত: তনচংগ্যা

 

বাংলার বর্ষবরণ ও বর্ষ-বিদায়কে তনচংগ্যা ভাষায় বিষু বলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য জনগোষ্ঠীদের মতো তনচংগ্যারাও বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনায় এ বিষু উৎসব অনুষ্ঠান উদযাপন করে। বিষু উৎসবে মানুষের ঘরে ঘরে সাড়া পড়ে যায়। আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব একজন অন্যজনের বাড়িতে বেড়াতে যায় বা আসে।

এ বিষু তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে, তিনদিনে তিন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যথা- ফুলবিষু, মূলবিষু (চৈত্রসংক্রান্তির শেষ দিন) ও গুজ্যা-পূজ্যা দিন বা নতুন বছর। এ তিনদিন তনচংগ্যারা কোন প্রকার প্রাণীহত্যা করেনা। বিষু উৎসবের জন্যে প্রত্যেক ঘরে ঘরে পাইচন (এক জাতীয় সবজি খাবার, যেটাতে প্রায় হরেক রকমের শাকসবজি থাকে অনেকে শতরকমের দেয়), ঐতিহ্যবাহী পিঠা বানায় যেমন- সাইন্ন্যাপিঠা (নারিকেল, চিনি ও আতপ চালের গুড়া দিয়ে মাখিয়ে বানানো হয়), বিনিপিঠা (বিনি চাল, নারিকেল ও চিনি দিয়ে বানানো হয়), কলাপিঠা (কলার সাথে চালের মিশ্রণে বানানো হয়), গুলিকপিঠা (বিনি চালের ময়দা দিয়ে মার্বেল মতো করে বানিয়ে দুধ, চিনি, শুকনা আঙুর ও নারিকেল গুড়া দিয়ে বানানো হয়) , আলসিপিঠা (চাল, কলা ও কাকন চাল দিয়ে মিশ্রণ করে বানানো হয়) ইত্যাদি। কিছু কিছু ঘরে পানীয়জল মদও বানানো হয়। বিষুকে উপলক্ষ করে ঘরের চারপাশ, আঙিনা, এমনকি ঘরের তৈজসপত্র বা আসবাবপত্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। তবে বর্তমান সময়ে বিষুতে মদের প্রচলন কমে আসছে এবং আগের মতো সমাজেও বিষু নিয়ে এত্ত উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়না। কোন বিষুতে কি কি করা হয়;

১. ফুল বিষু:চৈত্রের শেষের দু'দিনের প্রথম দিনকে তনচংগ্যারা ফুল বিষু বলে আখ্যায়িত করে। এ দিনে খুব সকাল সকাল স্নান ছেড়ে ফুল তুলে ঘর সাজাই, বুদ্ধ ও গঙ্গাদেবীকে ফুল দিয়ে পূজা করে। বিহারে গিয়ে ফুল পূজা করা হয়। পাড়ার যুবক যুবতীরা কলসিতে করে পানি এনে গ্রামের বুড়া বুড়িদের স্নান করায়। অনেকে নতুন কাপড় চোপড়ও উপহার স্বরূপ দেয়। এভাবে বিষুর প্রথম দিন অতিবাহিত হয়।

২. মুল বিষু:চৈত্রের শেষ দিনটিকে তনচংগ্যারা মূল বিষু বলে। মূলত এই দিনের উৎসবটাই মূল উৎসব। এ দিনে প্রায় ঘরে পাইচন দেখা যায়। কোন অতিথি গেলে পাইচনসহ বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি ও ফলমূল দিয়ে পরিবেশন করা হয়। পরস্পরের ঘরে আসা যাওয়া করে, নিমন্ত্রণ করে। এ দিনে পাড়ার কোন মাঠে বা স্কুল বিহার প্রাঙ্গনে ঘিলা খেলাসহ নাদেংখেলা, হরেক রকমের তনচংগ্যাদের পুরনো খেলা আয়োজন করা হয়। এ দিনে পাড়ার যুবক যুবতী বা প্রেমিক প্রেমিকা একসাথে দলে দলে বেড়ায়। সারাদিন হৈ চৈ আনন্দ করে দিনটাকে অতিবাহিত করা হয়।

৩. গুজ্যাপূজ্যা বা নতুন বছর:নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখকে তনচংগ্যারা গুজ্জ্যাপূজ্যা দিন বা নয়া বছর বলে। গুজ্জ্যাপূজ্যা দিন মানে গড়াগড়ি যাওয়া। তিনদিন ব্যাপী বিষু উৎসবে এটিই শেষ দিন। কথিত আছে, অতীতে এ দিনে বেশি ভোজন করত এবং মদও পান করতো। ফলে বেশি ভোজনে বিছানায় গড়াগড়ি করে ঘুমাতো। তবে এদিনে অনেকে বিহারে যায় ধর্মীয় বাণী শ্রবণ করে, অনেকে আবার শ্রামণ্য দীক্ষা নেয়। এ দিনে পাড়ার মুরব্বিরা গল্পেস্বল্পে অলস দিন কাটিয়ে দেয়। অনেকে আবার পুরনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতে দেখা যায়। এ দিনে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনেক সময় গেংগুলি গানের আসর বসে। এতে পাড়ার যুবক যুবতীরা হৈ হুল্লুড় করে, আনন্দ করে।
এভাবে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে তনচংগ্যারা বিষু উদযাপন করে। বিষু উৎসবের বিভিন্ন কার্যাদি ও আচার সবই তনচংগ্যা সংস্কৃতির সম্পর্কিত।

প্রসঙ্গ ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা:
ঘিলা খেলা তনচংগ্যা অতি প্রাচীনতম খেলা। তনচংগ্যাদের জাতীয় খেলা "ঘিলাখেলা" হিসেবে সমধিক প্রচলিত। বিষুর সপ্তাহ আগে থেকে এ খেলা খেলতে শুরু করে গ্রামের গাবুজ্জ্যা গাবুরিরা (যুবক যুবতীরা)। বেশ উপভোগ্য ও জয় পরাজয়ের খেলা, ঘিলাখেলা। অনেক সময় গাবুরে মাঙ্গুউনে অর্থাৎ যুব বনাম আধ বুড়া বুড়ি বা নর নারী দু'দলে ভাগ হয়ে ঘিলাখেলা খেলা হয়। তনচংগ্যা জাতির বিভিন্ন বুড়াদের মতে ঘিলাখেলা সাধারণত পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে, যথা: মক খেলা, কুইচুক খেলা, গামাইত খেলা, ব্যাঙ খেলা ও পাইচ খেলা। ঘিলা খেলা খুবই আনন্দদায়ক হয়। তবে অন্যান্য খেলার মতো ঘিলা খেলায়ও বেশ নিয়ম ও ধরাবাঁধা আছে। মেয়েরা কুইচুক খেলা খেলতে বেশি পছন্দ করে বলে জানা যায়।
তনচংগ্যাদের ঘিলা খেলা নিয়ে তনচংগ্যা কিংবদন্তি ও কবিরত্ন (ড. মনিরুজ্জামানের ভাষায়) শ্রী কার্ত্তিক চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা (১৯২০-১৯৯৭) তাঁর স্বরচিত "রাধামন ধনপতি কাব্যে" বেশ কিছু রোমাঞ্চকর কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি লিখেছেন-
"সমাগত প্রায় বাসন্তী পূর্ণিমা এল যে বৎসর ঘুরি,
আনন্দ উল্লাসে মেতে নবজাগরণে যত নরনারী।
সমাজের প্রথা বাঁধাধরা নাই বাসন্তী পূর্ণিমা রাতে,
যুবক যুবতী ঘিলা খেলা খেলে মিলেমিশে এক সাথে।
সেই পল্লীর অঙ্গণে যুবক যুবতী যতজন আছে,
কুঞ্জবী-কুঞ্জধন, নিলংবী-নিলংধন আনন্দ উল্লাসে।
মেয়াবী-মেয়াধন, কানেকবী-কানেকধন সবে মিলে তারা,
ঘিলা খেলা খেলিবে সবায় বাসন্তী পূর্ণিমা রাতে যারা।
মেঘরং চুলের বেণী পিছনে ঝুলায়ে ধনপতি,
কুরঙ্গ নয়না ক্ষীণকটি মুষ্টি প্রেম রূপসী যুবতী।
বাসন্তী উৎসবে যুবক যুবতী যত আনন্দেতে মাতে,
ধনপতি ধীরেধীরে মিলন হইল- রাধামন সাথে।
বিশাল উঠানে ঘিলাখেলা হবে যুবক যুবতী মিলে,
একধারে নারী আর এক ধারে নর বিপক্ষেতে খেলে।
যুবক যুবতী খেলে বাসন্তী উৎসব করিবে পালন,
ধনপতি রাধামন ও কুঞ্জবী কুঞ্জধন খেলিবে তখন।
সেইদিন রাধামন ধনপতি যুবক যুবতী দল,
বাসন্তী পূর্ণিমা রাতে প্রেমিক প্রেমিকা যারা মিলিয়া সকল।
সারাটা রজনী ঘিলা খেলা খেলে তারা আনন্দ উল্লাসে,
জোৎস্নার আলো ছায়াতলে বিশ্রাম করে ঘিলাখেলা শেষে।
আলাপনে জিজ্ঞাস করিল ধনপতি রাধামন কাছে,
দেব পুত্তি ঘিলা খেলা ইহা কোথায় কোন গহন বনে আছে।
রাধামন কহিল তখন দেব ঘিলা মাহাত্ম্য কথন বিষয়,
গহন বনেতে উচ্চ বৃক্ষোপরে ঘিলার লতা হয়।"

পাঠক তাহলে কবির লেখায় অনুমান করা যায় আগের দিনে রাধামন ধনপতিরাও গ্রামের যুবক যুবতীদের সাথে মিলেমিশে নর নারী ভাগ হয়ে ঘিলাখেলা খেলতো বাসন্তী রাতে মানে চৈত্র মাসের পূর্ণিমারাতে। বেশ উপভোগ্য ও আনন্দের খেলা বটে। শুধু ঘিলা খেলা করা জন্য এ ঘিলা ব্যবহার হয়না। তনচংগ্যা সমাজে দেখা যায় কোন বাচ্চা জন্ম হওয়ার সপ্তাহ বা পক্ষের পর ঘিলা, স্বর্ণ বা রূপার পানি দিয়ে বাচ্চা ও পরিবারের সবাইকে পবিত্র মানে পরিশুদ্ধ করা হয় যেটাকে বলা হয় ঘিলা কসুই পানি। তারমানে তনচংগ্যাদের কাছে ঘিলা একটা পবিত্র ফল। অতঃপর ঘিলার সাথে বিষুর যেমন সুসম্পর্ক রয়েছে তেমনি ঘিলা খেলার সাথে তনচংগ্যা যুবক যুবতীদের প্রেম ভালোবাসা ও আত্মার সম্পর্ক আছে।
*ঘিলা- খয়েরি রঙের আবরণ যুক্ত গোলাকার বিচি বা বৃত্তাকার সীমের বিচির মতো। এ ফল সাধারণত গহীন অরণ্যে পাওয়া যায়। গাছ লতা জাতীয় হয়।

 

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন:
আরও সংবাদ পড়ুন