ঢাকা, ১৩ জুন রবিবার, ২০২১ || ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
 নিউজ আপডেট:

শ্রমিকের রক্ত শুকানোর পূর্বেই মামুনুল হক গ্রেফতার

ক্যাটাগরি : মুক্তমত প্রকাশিত: ১৩৩৫ঘণ্টা পূর্বে


শ্রমিকের রক্ত শুকানোর পূর্বেই মামুনুল হক গ্রেফতার

জিকে সাদিকঃ

প্রথমেই একটা ভুল ভাঙাই। সেটা হইলো যারা আওয়ামী লীগকে মাথা মোটাদের দল কিংবা জনগণের দল ভাবেন এই দুই পক্ষই চরম বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন। কারণ আওয়ামী লীগ মোটেও মাথা মোটাদের দল না আর জনগণের দল তো না-ই। এই কথাটারে আরেকটু খুলে বলা দরকার। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে চরম দ্বৈতনীতি নিয়ে চলে এবং রং পাল্টায়। তথা গিরগিটি মার্কা। আমি এখন যে আওয়ামী লীগকে সমালোচনা করলাম এই আওয়ামী লীগের সাথে '৭১ এর আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি মিলাতে গেলে ভুল করবেন। কারণ '৭১ এ আওয়ামী লীগ কোনো দল ছিল না সেটা হয়ে গেছিল 'জনমোর্চা'। '৭১ এর পর আওয়ামী লীগ তার মধ্যেবিত্ত বুর্জোয়া চরিত্রে সংকটের কারণেই দেশ পরিচালনায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল। বঙ্গবন্ধু বাধ্য হয়ে এই দল বিলুপ্ত করে দিয়ে বাকশাল নামে একটা 'ফ্রন্ট' (আমি দল বলবো না) করছিল। বাকশাক নিয়ে ইতিবাচক নেতিবাচক অনেক আলাপ হইতে পারে তবে এটা নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। কারণ বাকশালের প্রয়োগ হয়নি। যার প্রয়োগ হয়নি সেটার ভালোমন্দ আলোচনা করা যায় না। মনে রাখবেন বঙ্গবন্ধু নিজেই আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করেছিল। বর্তমানে যে আওয়ামী লীগ আছে সেটা বঙ্গবন্ধু হত্যার পরের আওয়ামী লীগ। তাই আমার আলোচনা গুলি ফেলবেন না।

এই যে আজকে হঠাৎ করে হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে গ্রেফতার করে মিডিয়াতে আলোচনায় আনা হলো। অথচ গ্রেফতার করার কথা ছিল এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার গ্রেফতার করলো মামুনুল হককে। যার কোনো পলিটিকাল ভিত্তি নাই, কোনো স্যোসাল ভ্যলু নাই। এমনি দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কোনো ভালো কাজ নাই। ওয়াজ-মাহফিল করে খাইতো। সরকার এই লোকটারে টানাটানি করে আলোচনায় নিয়ে আসছে। এতোটাই আলোচনায় আনছে যে কোন মেয়ে নিয়ে কই যায় সেইটাও নজরদারি করছে। ওর 'শত প্রেমের' কাহিনী, প্রেমালাপ, প্রেমিকার ডায়েরি মিডিয়ায় প্রকাশ করতাছে। লেইমপনার একটা সীমা থাকা উচিত ছিল। 

গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে বেতনের দাবিতে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৫ জনকে জায়গায় মেরে ফেলা হলো। প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে এই ঘটনা সেটা এস আলম গ্রুপের। এই এস আলম গ্রুপের ঋণ খেলাপি আছে, গত বছর সম্ভবত এদের বড় একটা অংকের ঋণ খেলাপি মাফ করেও দেয়া হয়েছে। বলতে গেলে এদের অপকর্মের ফিরিস্তি শেষ হবে না।

গতকাল শ্রমিকরা আন্দোলন করেছে তাদের আটকে থাকা বেতনের দাবিতে। সরকার বা প্রশাসন কতটা মুরোদহীন এবং শ্রমিকদের নিয়ে উদাসীন যে বেতন নিয়ে দিতে পারে নাই। উল্টো বেতন দাবি করার কারণে মালিক পক্ষের হয়ে শ্রমিকদের উপর গুলি চালিয়েছে। এই ঘটনার জন্যই তো আওয়ামী লীগের আর ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তি নাই। যদিও তারা ক্ষমতায় এসেছেই অবৈধভাবে। তারপর নৈতিকতার আলাপ দেয়াটাই বেমানান। শ্রমিকদের উপর গুলি চালানোর ঘটনায় দায়িত্বরত পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করার কথা। সেটা করা হয়নি। বরাবরের মতো পার পিস লাশের দাম ঘোষণা করা হয়েছে- ৩ লাখ। এই হলো অবস্থা। এই ইস্যুকে তল করতে আজকে মানুষ মামুনুল হককে গ্রেফতারের নাটক করে বসলো। মিডিয়া ফোকাস এখন মামুনুল হক। অথচ শ্রমিকের রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি।

এই হেফাজত সব সময়ই একটা ক্যাচাল লাগায়। হুট করে ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করলো। যেটার কোনো যৌক্তিকতাই নাই। তখন ২৫টি পাটকল ও ৬টি চিনিকল বন্ধের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছি। ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পরেছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বে গতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এসব কোনো কিছু নিয়ে হেফাজতের কোনো কর্মসূচি ছিল না। হুট করে এসব আন্দোলনের মধ্যে ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করে মিডিয়া ফোকাস নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন, ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন সব কিছু মাটি করে বসলো। একইভাবে মোদি বিরোধী আন্দোলনটাও এরাই নষ্ট করেছে। এসব আন্দোলনের ফাঁয়দা লুটেছে আওয়ামী লীগ। হেফাজতের আমীর বাবুনগরী তো ঘোষণাই দিয়েছে আওয়ামী লীগ আগামী ২'শ বছর ক্ষমতায় থাকুক।

এই যে শ্রমিকদের আন্দোলন নির্বিচারে গুলি এ নিয়ে হেফাজতের কোনো কথা নাই। যদি কেউ ইসলামের কোন একটা বিষয়ে ফেইসবুকে পোস্ট করতো তাহলেই এদের চেতনা-ইমান সব এক সাথে লাফ দিয়ে ফাল মেরে রাস্তায় চলে আসতো। অথচ শ্রমিক হত্যা নিয়ে টু শব্দ করে নাই। করে নাই তো করেই নাই বরং এই ইস্যুকে এখন উল্টাই দিবে। সারাদেশে এখন মামুনুলের অনুসারীরা নামবে। মিডিয়া, প্রশাসন, সরকার সব তাদের নিয়েই পরে থাকবে। ওই দিকে শ্রমিক হত্যার বিচার তলে পরে যাবে।

আজকেই মামুনুল হককে গ্রেফতার করতে হলো! গত কয়েকদিন থেকে পুলিশ মামুনুল হককে খোঁজ ছিল কিন্তু পাইতাছিল না। অথচ সে লাইভে আসছিল। বাংলাদেশের পুলিশ যে এইসব কাজে দুর্বল এইটা আগেই জানতাম। তাদের সক্ষমতার ঠেলা বুঝায় থানা পাহারা দেয়ার জন্য যখন এলএমজি স্থাপন করে। এই মামুনুলকে আজকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার কিছুই হবে না। কয়েকদিন সরকারি খরচে পাবলিকের টাকায় কয়েদখানায় বসিয়ে খাওয়ানো হবে তার পর ছেড়ে দিবে। মিডিয়া রাত দিন এটা নিয়েই পরে থাকবে। বাঙালি মুসলিমদের ইমানি জেহাদ এই নিয়েই চলবে ওদিকে যে শ্রমিক মেরে ফেলা হলো তা নিয়ে কোনো কিছুই এরা বলবে না। মামুনুল কয়েকদিন পর বের হয়ে আসবে, ইমানি জেহাদ থামবে, সরকারও শ্রমিক হত্যার আন্দোলন ও বিচারের দায় থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। এই হলো হেফাজত আর এই হলো আওয়ামী লীগ। সো আওয়ামী লীগকে মাথা মোটাদের দল ভাবার কারণ নাই। আর হেফাজতকেও ইসলামের হেফাজতকারী, মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষাকারী দল ভাবা মতো ভুল করা যাবে না।

হেফাজত নেতারা এই দেশের সাথে, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিষ্ঠান কাল থেকেই নানাভাবে প্রতারণা করে আসছে। গত ২৬ মার্চের পর এতোগুলো ছাত্র হত্যা করা হলো এসব কিছুর দায় মাড়িয়ে মামুনুল গেলো 'বৌ' নিয়ে রিসোর্টে। আর গত ৪ তারিখে বাবুনগরী তার বক্তব্যে বললো এই সরকার ২'শ বছর ক্ষমতায় থাকুক আমাদের সমস্যা নাই। কথা একদম খাঁটি। ওদের একটুও সমস্যা নাই। সমস্যা এই দেশের মানুষের। কারণ আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন একটা দল। জনতার উপর যে নির্মমতা শুরু করেছে সেটা করতে গিয়ে ধর্ম তার কাছে অন্যতম হাতিয়ার। আর হেফাজত তো বাংলাদেশে ধর্মের জিম্মা নিয়েছে।

এই দেশকে রক্ষা করতে হলে যেমন হেফাজত মার্কা দলের বংশ বিনাশ করতে হবে তেমনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দলগুলোকেও বিনাশ করতে হবে। যতোদিন এগুলো না হচ্ছে ততোদিন ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতার রক্ত ঝরবেই।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন:
আরও সংবাদ পড়ুন