ঢাকা, ১৩ জুন রবিবার, ২০২১ || ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
 নিউজ আপডেট:

আমাদের রাখাল দা- পর্ব ১ (বাবু রাখাল চন্দ্র নন্দী)

ক্যাটাগরি : শিক্ষা ও ক্যাম্পাস প্রকাশিত: ৮৭৬ঘণ্টা পূর্বে


আমাদের রাখাল দা- পর্ব ১  (বাবু রাখাল চন্দ্র নন্দী)

লেখক: মোঃ নূরুল আনোয়ার মামুন 
আমেরিকা প্রবাসী।

শীতের মিষ্টি রোদে ছাত্র ছাত্রীরা স্কুলের সামনের মাঠে সবুজ ঘাসের চাদরে বসে আলোর প্রতিসরণের ব্যাবহারিক ক্লাস করছে। রাখাল দা ব্যস্ত একে একে সবাইকে কাগজের উপর কাঁচ নিয়ে আলোর প্রতিসরণের ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই বুঝতে সাহায্য করা। উপস্থিত আছেন নরেশ বি.এস. সি. স্যার। আমার ছেলে বেলার হাজার মধুর স্মৃতির মাঝে একটি হলো স্কুলের ব্যাবহারিক ক্লাস। আমি তখন খুব ছোট, খুব সম্ভব প্রাইমারিতে পড়ি। বড়দের ক্লাসে ঘুরে বেড়ানো ছিল আমার খেলার অংশ। কখনো মাঠে আঁতস কাচে সূর্য্যের রশ্মি একত্রিত করে কাগজে আগুন ধরানো, কখনো দোতলার উপর ক্লাসে সরল দোলকের বিরামহীন গতির দিকে তাকিয়ে থাকা, আবার রসায়ন ল্যাবে এসিডের নীল লিটমাসের লাল করন প্রক্রিয়া। নানাবিধ  ব্যাবহারিক ক্লাস আমাকে আনন্দিত করতো। ছোট বেলার ছাত্র না হয়েও রাখাল দা কে অনেক বিরক্ত করেছি, বিভিন্ন কৌতুহলী প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছি। রাখাল দা সব সময় আমাকে আদর করতেন।  স্কুলের টিফিনের সময় আমাকে দেখলে কাছে ডেকে আমার হাতেও টিফিন তুলে দিতেন। ছাত্রদের অনেক আন্তরিক ভাবে সহায়তা করতেন। ফুলপুরের বিজ্ঞান মেলায় অংশ গ্রহনের সময় ছাত্র ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রজেক্ট বানাতে সহায়তা করতেন। যেমন কাঠ আর ধানের তুষ দিয়ে তাপ নিরোধক বাক্স যেখানে খাবার রাখা যায়,  সৌর চুল্লী ইত্যাদি ইত্যাদি। 

ব্যাবহারিক ক্লাস ছাড়াও স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতেন। স্কুলের পিকনিক, বার্ষিক খেলা ধুলোর আয়োজনে সব সময় অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন।আমার বাবার (হক স্যারের) একজন বিশ্বস্ত টিমমেট হিসেবে স্কুল পরিচালনায় সহায়তা করতেন। স্কুল ছিল তার জীবনের একটি বড়  অংশ। তখনকার দিনে শুধু বেতনের জন্য কেউ কাজ করতো না, পয়সা কামানোই জীবনের লক্ষ্য ছিল না। রাখাল দা খুব সাদা মিটে মানুষ ছিল। সব সময় পাজামা আর পাঞ্জাবী পড়তেন,  খুব বেশী কাপড় চোপড় ছিল না। দেখে সহজেই বোঝা যেত গায়ের কাপড়ের বয়স। 

রাখাল দার সাথে শেষ কথা হয়েছে ২০১৬ সালে। আমি জাপানে থাকতে ফোন দিয়েছি। আমার ফোন পেয়ে অনেক খুশি হয়েছিলেন। অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন আমাদের দীর্ঘ দিন না দেখতে পেয়ে।

রাখাল দা আর নেই। একজন কাছের মানুষ চলে গেল। আমি উনার কাছ থেকে অনেক উপদেশ নিয়েছি, পরামর্শ করেছি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। উনি আমার পরিবারকে সব সময় বিভিন্নভাবে সহায়তা করতেন। সৎ, নিষ্ঠাবান, অসাম্প্রদায়িক সর্বোপরি পরিপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন। তার মতো মানুষ পাওয়া আজকাল বড়ই কঠিন। 

বাবু রাখাল চন্দ্র নন্দী গত ১লা মে ২০২১ সন্ধ্যা ৭ঃ৪৫ মিনিটে ইহলোক ছেড়ে মহা প্রয়ানের যাত্রা শুরু করেছেন। ভারতের শিলিগুড়ি এলাকার কোন এক স্থানে চিতার দাহে ভস্মিত হয়েছে উনার দেহ। শেষ কৃত্যে অংশ গ্রহনের সুযোগ ছিলো না।  রাখাল দার প্রস্থান আমার হৃদয়কে আলোড়িত করেছে। তার চিতার আগুনের উষ্মতা আমি সুদূর আমেরিকায় বসেও পেয়েছি। সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা এই যে রাখাল দা যেন স্বর্গবাসী হোন।

(ছবিতে রাখাল দা আর তার স্ত্রী ক্ষমা দি)
(দ্বিতীয় পর্ব অচিরেই আসবে)

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন:
আরও সংবাদ পড়ুন